যান্ত্রিকীকরণে গার্মেন্টস শ্রমবাজারের সম্ভাব্য সংকট😔 এবং আমাদের প্রস্তুতি✌️


Latest Textile | তৌহিদুর রহমান


Facebook


বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্ট খাতের অবদান অনেক। বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানি থেকে। এর সঙ্গে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এ খাত, যার মধ্যে বিরাট সংখ্যক নারীও রয়েছে। আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয় বাদ দিলে গার্মেন্ট খাত থেকে সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়বে আরও। শুধু গার্মেন্ট খাতই নয়, দেশে চামড়া, পাট, পর্যটন, চা থেকে শুরু করে আরও অনেক খাত রয়েছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ কর্মরত রয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো, কোনো কারণে যদি এসব শিল্প খাতগুলো সংকটে পড়ে কিংবা বড় কোনো ধরনের পরিবর্তন হয় তাহলে আমরা তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে কতটা প্রস্তুত? সংকটে পড়ার সম্ভাবনাই আসলে কতটা?



মূলত দুটি ইস্যু নিয়ে আলাচনা করা এ লেখার মূল উদ্দেশ্য। প্রথমত, গার্মেন্টের মতো খাত সংকটে পড়লে আমরা মানিয়ে নিতে প্রস্তুত আছি কি না? দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান ও মানবিক সংকট? প্রথম ইস্যুটি নিয়ে খুব সীমিতই আলোচনা করব। সেক্ষেত্রে বলা যায়, একক পণ্য নির্ভরতার ব্যাপারটি বিশ্বের অনেক দেশেরই মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে। যে কারণে তারা অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার জন্য ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ সৌদি আরব। দীর্ঘদিনের তেল নির্ভরতা কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন খাতে ভিসা না দেওয়া হলেও এখন তা উম্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।  বৈদেশিক বিনিয়োগ আনতেও নানা ধরনের ছাড় দিচ্ছে দেশটি।

বাংলাদেশও তৈরি পোশাকের মতো একটি বিশেষ খাতে ব্যাপক নির্ভরশীল। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, মোট রপ্তানিতে এ খাতের অবদান ৮৪ শতাংশ। অবশ্য গার্মেন্ট খাতের মূল্য সংযোজন নিয়ে হতাশা ছিল দীর্ঘদিন। তাতে এখন মূল্য সংযোজনের পরিমাণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণমাধ্যমের খবর বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় তিন হাজার ৪১৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার। পোশাক রপ্তানির ওপর আমাদের অর্থনীতির বিশাল নির্ভরতা রয়েছে, উদ্বেগের জায়গাটা সেখানেই। আরও কিছু খাতেও অবশ্য এখন সামনে আসছে। বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাক খাতে শক্ত প্রতিযোগী ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষত ভিয়েতনাম যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে শিগগিরই বাংলাদেশকে তারা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

পরিসংখ্যান বলছে, সাত-আট বছর আগেও রপ্তানি বাজারে ভিয়েতনামের দখল ছিল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ ২০১৮ সালে রফতানি আয়ে তাদের বাজার দখল ছিল পাঁচ দশমিক ৯ শতাংশ। বিপরীতে আট বছর আগে বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানি আয়ে বাংলাদেশের দখল ছিল দুই দশমিক ছয় শতাংশ। এখন সে পরিমাণ বেড়ে হয়েছে মাত্র ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশ। অর্থাৎ ভিয়েতনাম প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলেই শিগগিরই দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হবে। এগিয়ে আসছে ভারতও। এভাবে যদি নির্ভরশীল খাতগুলো অন্য দেশের দখলে চলে যায়, তাহলে বাংলাদেশ কতটা সে পরিস্থিতি মোকাবিল করতে পারবে? এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরাও দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এ অবস্থায় আসলে বসে থাকার সুযোগ নেই। গার্মেন্টের মতো হাতেগোনা দু’একটি শিল্পে নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের বিকল্প খাতে মনোযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ভিয়েতনাম ও ভারতকে প্রতিযোগিতায় টপকে কীভাবে গার্মেন্ট খাত এগিয়ে যাবে বের করতে হবে সে উপায়ও।



এখন আসা যাক, দ্বিতীয় ইস্যুতে। কর্মসংস্থান ও মানবাধিকার সংকট। এটি আসলে বহুলাংশে প্রথমটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে শিল্প খাতে প্রযুক্তির দাপট শুরু হয়। চলতি একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রযুক্তির সংযোজন হয় আরও দ্রুত গতিতে। আর বর্তমান সময়ে এসে অন্য সব খাতের মতো শিল্প খাতেও প্রযুক্তির রাজত্ব চলছে। সব ধরনের কর্মকাণ্ডে এসেছে দারুণ গতি। এটি উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি সব ক্ষেত্রে ভালো খবর নিঃসন্দেহে। তবে আশঙ্কার জায়গাটা আসলে অন্য জায়গায়। প্রযুক্তির অগ্রগতি কিংবা যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে শিল্প-কারখানায় অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ক্রমেই জায়গা করে নিচ্ছে। আগে যেসব কাজ করতে ৫০ জন মানুষ একদিনে করতে পারত, এখন হয়তো একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটিক মেশিন সে কাজ এক ঘণ্টায় করে দিচ্ছে। এতে উৎপাদনে গতি এসেছে সত্য, তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের শিল্প-কারখানায় এ বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রকট হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে গার্মেন্ট খাতে প্রায় ৩৪ লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। সব মিলিয়ে উৎপাদন খাতে শ্রমিক সংখ্যা কোটির কাছাকাছি। বলাবাহুল্য এসব শ্রমিকের বড় অংশ হয়তো একটি পরিবারের ভরণ-পোষণ করান। চামড়া, পাটপণ্যসহ নিত্যনতুন আরও অনেক শিল্পে লাখ লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। কিন্তু এসব খাতে দেরিতে হলেও ক্রমেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে ক্রমেই শ্রমিকদের কর্মহীন হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আরও স্পষ্ট করে বললে, গার্মেন্ট খাতে এ সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

ডয়েচে ভেলের একটি প্রতিবেদন বলছে, কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সফটওয়্যার অটোমেশন সুইং যন্ত্র উদ্ভাবন করেছে, যার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাপড় কেটে প্রয়োজনমতো সেলাই করে জোড়া লাগানো যায়। এতে প্রচলিত কারখানার চেয়ে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কম শ্রমিক লাগবে, বিপরীতে উৎপাদন বাড়বে ৭০ শতাংশ। সুইংয়েই গার্মেন্ট খাতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক প্রয়োজন হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক তৈরিকারক দেশ চীন এ ধরনের যন্ত্র ব্যাপকহারে ব্যবহার শুরু করেছে। স্বাভাবিকভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানায়ও যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করেছেন। এটিকে গার্মেন্ট খাতে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার কারণ মনে করছেন অনেকে। অবশ্য খাতসংশ্লিষ্ট এবং বিশ্লেষকদের অনেকে শুধু এটিকেই কর্মসংস্থান কমার পেছনে কারণ বলতে নারাজ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, গার্মেন্ট শিল্প খাতের শ্রমিকদের মধ্যে পুরুষ ৫৩ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং নারী আছেন ৪৬ দশমিক ১৮ শতাংশ। কিন্তু নানা কারণে ক্রমেই নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমছে এ খাতে। এজন্য মূলত প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও দক্ষতায় ঘাটতিকে মূল কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে। গত চার বছরের ব্যবধানে পোশাকশিল্প খাতে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত সেলাইয়ে দক্ষতা নারীদের এ খাতে কর্মসংস্থানের মূল কারণ। কিন্তু পোশাকশিল্পে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে কয়েকজন নারী শ্রমিকের কাজ এখন যন্ত্রের মাধ্যমেই হয়ে যায়।

একটি যন্ত্র একই সঙ্গে অনেক ধরনের কাজ করতে পারে। ফলে নারী শ্রমিকদের চাহিদা কমছে, তারা প্রায়ই চাকরি হারাচ্ছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে পুরুষ শ্রমিকদের কাজও কিন্তু নিরাপদ বলার সুযোগ নেই। উন্নত বিশ্বে ইতোমধ্যে নারী-পুরুষ সবার কাজই যন্ত্রের দখলে চলে গেছে। বাংলাদেশ অবশ্য সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহারে কিছুটা পিছিয়ে। তারপরও ব্যবধান কমে আসছে। ক্রমেই বাড়ছে রোবটিক মেশিনের ব্যবহার। এতে আজ হোক কিংবা কালÑশ্রমবাজারে প্রযুক্তির আঘাত জোরালো হবেই। তবে সেটি কত দ্রুত হবে, অপেক্ষা সেটিই। শিল্পে এভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, কর্মীদের কর্মহীন হওয়ার পরিমাণও বাড়বেÑএটিই বাস্তবতা।

প্রক্রিয়াটি যতটা জোরালো হবে, দেশে মানবিক সংকটও কিন্তু ততটা জোরালো হবে। আগেই বলেছি, শিল্প খাতের প্রায় প্রতিটি শ্রমিকের ওপর একটি পরিবারের ভরণ-পোষণ নির্ভর করে। একজন যখন কর্মহীন হবে, তার প্রভাব পড়বে গোটা পরিবারের ওপরই। আমাদের দেশের বাস্তবতা হলোÑজনসংখ্যার আধিক্য, দক্ষতার ঘাটতি, কাজের সুযোগ না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে কর্মস্থানের সুযোগ সীমিত। ফলে কেউ কর্মহীন হয়ে পড়লে তার বিকল্প কাজের সংস্থান করতে গিয়ে অনেক সময় প্রয়োজন হয়। এ সময়টা পরিবার নিয়ে তাদের কতটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তা বলে না দিলেও চলে। ফলে বড় মানবিক সংকটের মুখে পড়ে পরিবারগুলো।

বিষয়টি যে শুধু শঙ্কার মধ্যে রয়েছে তা কিন্তু নয়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টে প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে মানবাধিকার সংকটের বিষয়টিকে বেশ উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে। জাতিসংঘের চলতি বছরের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে এ দিকটি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কতটা পরিবর্তন আনবে তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে এখন যেসব কাজ মানুষ করেনÑকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বয়ংক্রিয়তা মানুষের জায়গা দখল করবে তাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। কারণ শিল্প-কারখানায় প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি মানে সেখানে মানুষের চাহিদা কমে আসা।

আমাদের দেশে একটি নজির রয়েছে। দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে কিশোর বয়সে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে অনেক ছেলেমেয়ে। তারা তখন পরিবারের বোঝা হয়ে না থেকে কিংবা আয়ের সুযোগ খুঁজতে প্রায়ই শহরে পাড়ি জমান। একপর্যায়ে তাদের বড় অংশই যুক্ত হয় গার্মেন্টের মতো শিল্প-কারখানায়। পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাবে এবং সুযোগ না থাকায় তারা তেমন বিকল্প কোনো কিছুতে দক্ষও হতে পারেন না। এ অবস্থায় যদি প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার কারণে চাকরি চলে যায়, স্বাভাবিকভাবেই ওই খাত ছাড়া অন্য কোনো কাজের সংস্থান করতে তাদের বেগ পেতে হবে। প্রযুক্তি খাতে যে ধরনের লোকবলের প্রয়োজন হবে বা হচ্ছে, তাতেও তাদের যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকবে কম। বিবিএস কিংবা এ জাতীয় অন্য অনেক প্রতিবেদনেও কিন্তু বিষয়গুলো উঠে এসেছে। ফলে এ জায়গাটিতে আমাদের যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে।



অবশ্য খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা এবং যন্ত্রের ব্যবহারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কাজ করছেন তারা। জার্মানির দি ইনস্টিটিউট ফর টেক্সটাইল টেকনিক অব দ্য আরপিডাব্লিউএইচ আখেন ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় ম্যাককিনসি অ্যান্ড কোম্পানি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সে অনুযায়ী, কারখানার সেলাই পর্যায়ে ৯০ শতাংশ শ্রমিকের কাজ এখন যান্ত্রিকীকরণ সম্ভব। অন্যান্য ধাপেও যন্ত্র ব্যবহার করে শ্রমিক কমিয়ে আনা যাবে। বলাবাহুল্য, এমন প্রযুক্তি কারখানাগুলো যত দ্রুত সংযোজন করতে পারবে, বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়ও টিকে থাকার সক্ষমতা ততটা অর্জন করতে পারবে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেদিকেই ঝুঁকছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শ্রমিকরাই।

বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে গার্মেন্ট খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে দুই শতাংশ করে। আর ওই সালে ৩০ লাখ থেকে ২০১৭ সালে শ্রমিক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ লাখে। কিন্তু টেক্সটাইল কিংবা বস্ত্র শিল্পে চার লাখের বেশি কর্মসংস্থান কমেছে। ২০১৩ সালে ১৮ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত থাকলেও ২০১৭ সালে নেমে দাঁড়ায় ১৪ লাখে। আরও উদ্বেগের খবর হলো, ২০১৩ সালে দেশে উৎপাদন খাতে ৯৫ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত থাকলেও ২০১৭ সালে দাঁড়ায় সাড়ে ৮৭ লাখে। বছরে কর্মসংস্থান কমেছে এক দশমিক ছয় শতাংশ। এ খাতের কর্মসংস্থানের প্রায় ৬০ শতাংশই গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলের।



সব মিলিয়ে গার্মেন্টসহ গোটা উৎপাদন খাতে প্রযুক্তির ছোঁয়া ভালোভাবেই লাগতে শুরু করেছে। কিন্তু এতে যে পরিমাণ শ্রমিকের কর্মহীন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে বিকল্প ব্যবস্থা এখনও তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এটুআই এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও’র গবেষণা অসনুযায়ী, যন্ত্রের ব্যবহারের কারণে দেশে পাঁচটি খাতে প্রায় ৫৩ লাখ কর্মী ঝুঁকিতে আছেন। এর মধ্যে ২০৪১ সালের মধ্যে শুধু তৈরি পোশাক খাতেই ২৭ লাখ কর্মহীন হতে পারেন; যা মোট কর্মীর প্রায় ৬০ শতাংশ। ঝুঁকিতে রয়েছে চামড়া, পর্যটন, কৃষিসহ আরও অনেক খাত।

সবশেষ কথা হলো, প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ক্রমেই ঝুঁকি বাড়ছে এটিই বাস্তবতা। আমাদের ঝুঁকি এ কারণে বেশি যে, গার্মেন্টস খাতে কর্মসংস্থান সর্বোচ্চ। একক পণ্যের ওপর নির্ভর করে কোনো দেশের অর্থনীতি চালিয়ে নেওয়া যেমন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিশ্বের অনেক দেশ এসব ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে বৈচিত্র্য আনার কাজে মনোযোগ দিয়েছে। ফলে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন খাত তৈরি হচ্ছে। আমাদেরও এখন সেদিকেই মনোযোগ দিতে হবে দ্রুত। বিদ্যমান শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নতুন যারা শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন, তারা যাতে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন সে বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। সম্ভাবনাময় সব ধরনের খাতের উন্নতিতে উদ্যোগ নিতে হবে দ্রুত। এতে হয়তো বা যান্ত্রিকীকরণের ফলে কর্মহীনতার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। আর এ কাজগুলো যত দ্রুত এবং যতটা দক্ষতার সঙ্গে করা যাবে, ততই মঙ্গল। অন্যথায় পরিস্থিতি কতটা অনুকূলে থাকবে বলা মুশকিল।


কপিরাইট ধারক:
[তৌহিদুর রহমান, গণমাধ্যমকর্মী (touhiddu.rahman1@gmail.com)] 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ