
Latest Textile | Zohir Ahmed Ridoy
আমারা সকলেই প্রায় তাঁত শব্দটির সাথে পরিচিত। "তাঁত বোনা" শব্দ কটি এসেছে "তন্তু বায়ন" থেকে। তাঁত বোনা যার পেশা সে হল তন্তুবায় বা তাঁতী।
"তাঁত" হচ্ছে এক ধরণের যন্ত্র যা দিয়ে তুলা বা তুলা হতে উৎপন্ন সুতা থেকে কাপড় বানানো যায়। তাঁত বিভন্ন রকমের হতে পারে। খুব ছোট আকারের হাতে বহন যোগ্য তাঁত থেকে শুরু করে বিশাল আকৃতির স্থির তাঁত দেখা যায়। আধুনিক বস্ত্র কারখানা গুলোতে স্বয়ংক্রিয় তাঁত ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
▶️ কিভাবে তাঁতকলের (Loom) পাদুর্ভাব ঘটে এদেশে?
✔️"তাঁত শিল্পের ইতিহাস" সঠিক বলা মুশকিল ইতিহাস থেকে জানা যায়, আদি বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরাই হচ্ছে আদি তাঁতি অর্থাৎ আদিকাল থেকেই এরা তন্তুবায়ী গোত্রের লোক। এদেরকে এক শ্রেণীর যাযাবর বলা চলে!
শুরুতে এরা সিন্ধু অববাহিকা থেকে পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদে এসে তাঁতের কাজ শুরু করেন। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া শাড়ির মান ভালো হচ্ছে না দেখে তারা নতুন জায়গার সন্ধানে বের হয়ে পড়েন, চলে আসেন বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে। সেখানেও আবহাওয়া অনেকাংশে প্রতিকূল দেখে বসাকরা দু’দলে ভাগ হয়ে একদল চলে আসে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, অন্যদল ঢাকার ধামরাইয়ে।
তবে এদের কিছু অংশ সিল্কের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজশাহীতেই থেকে যায়। ধামরাইয়ে কাজ শুরু করতে না করতেই বসাকরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে ভাগ হয়ে অনেক বসাক চলে যান প্রতিবেশী দেশের চোহাট্টা অঞ্চলে। এর পর থেকে বসাক তাঁতিরা চৌহাট্টা ও ধামরাইয়া’ এ দু’গ্রুপে স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েন।
✔️তাছাড়া তাঁত শিল্পের ইতিহাস সম্পর্কে আরো জানা যায় যে তাঁত শিল্প মনিপুরীরা অনেক আদিকাল থেকে এই বস্ত্র তৈরি করে আসছে।
"মনিপুরীদের বস্ত্র তৈরির তাঁতকল" বা মেশিন প্রধানত তিন প্রকার। যেমনঃ
১। কোমরে বাঁধা তাঁত,
২। হ্যান্ডলুম তাঁত ও
৩। থোয়াং।
এই তাঁতগুলো দিয়ে সাধারণত টেবিল ক্লথ, স্কার্ফ, লেডিস চাদর, শাড়ি, তোয়ালে, মাফলার, গামছা, মশারী, ইত্যাদি ছোট কাপড় তৈরি হয়। প্রধানত নিজেদের তৈরি পোশাক দ্বারা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতেই মনিপুরী সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁত শিল্প গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে তাঁত শিল্পে নির্মিত সামগ্রী বাঙালি সমাজে নন্দিত ও ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে নকশা করা ১২ হাত মনিপুরী শাড়ি, নকশি ওড়না, মনোহারী ডিজাইনের শীতের চাদর বাঙালি মহিলাদের সৌখিন পরিধেয়।
▶️ তাঁত শিল্পের বিকাশঃ
✔️কুটির শিল্প হিসেবে হস্তচালিত তাঁত শিল্প বৃটিশ পূর্বকালে কেবল দেশেই নয় বর্হিবাণিজ্যেও বিশেষ স্থান দখল করেছিল। বংশ পরম্পরায় দক্ষতা অর্জনের মধ্যদিয়ে বয়ন উৎকর্ষতায় এ দেশে তাঁতীরা সৃষ্টি করেছিল এক অনন্য স্থান। কিন্তু বৃটিশ আমলে অসম করারোপ, তাঁত ব্যবহারের উপর আরোপিত নানা বিধি নিষেধ, বৃটিশ বস্ত্রের জন্য বাজার সৃষ্টির নানা অপকৌশলের কাছে তাঁতী সমাজ তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেনি। ক্রমান্বয়ে তাঁত শিল্পে সংকট ঘনীভূত হতে থাকে।
স্বাধীনতার পরও সে সংকটের তেমন কোন সুরাহ হয়নি। বাজার অর্থনীতি সম্প্রসারণে তাঁতীদের সমস্যা আরো জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে মুক্ত বাজার অর্থনীতির আড়ালে হচ্ছে পরোক্ষ আগ্রাসনের শিকার নানা ধরণ, নানা রং, নানা ডিজাইনের কাপড়ের অবাধ প্রবেশের ফলে বাজার চলে গেছে সনাতনী তাঁতীদের প্রতিকূলে। মুদ্রা অর্থনীতির প্রসারের ফলে দেখা দিয়েছে পুঁজি সংকট। সে সুযোগে মহাজনের কাছে সেবাদাসে পরিণত হয়েছে অধিকাংশ প্রান্তিক তাঁতী ও তাঁত মালিক। সুতা, রং রসায়নের জন্য মহাজনের কাছে বাধা হয়ে বাধা পড়তে হচ্ছে তাঁতীদের।
▶️ আমাদের অর্থনীতিতে তাঁত শিল্পের ভূমিকাঃ
✔️বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁত শিল্পের ভূমিকা অপরিসীম। হস্ত চালিত তাঁতে বছরে প্রায় ৭০ কোটি মিটার বস্ত্র (Finished Fabric) উৎপাদিত হয় যা অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৪০ ভাগ মিটিয়ে থাকে। এ শিল্প থেকে মূল্য সংযোজন করের পরিমাণ প্রায় ১৫০০.০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের হস্ত চালিত তাঁত শিল্প এদেশের সর্ববৃহৎ কুটির শিল্প। সরকার কর্তৃক সম্পাদিত তাঁত শুমারী ২০০৩ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৫ লক্ষাধিক হস্তচালিত তাঁত রয়েছে। দেশের মোট কাপড়ের চাহিদার শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ যোগান দিচ্ছে তাঁত শিল্প এবং প্রায় ৫০ লাখ লোক সরাসরি এই শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে । শুধুমাত্র মনিপুরীরা ২০০৯ সালে ২২ লাখ টাকার যুক্তরাজ্যে তাদের রপ্তানি শুরু করে এবং ২০১০ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১ লাখ টাকায়। ২০১২ সালে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার মণিপুরী কাপড় যুক্তরাজ্যে রপ্তানি করা হয়েছে ।
✔️কালে কালে পোশাকের রকম-ধরনে নানা পরিবর্তন এসেছে। নিছক তর্কের খাতিরে নয়, চিন্তা বা মননের দিক থেকে এখনও ‘সভ্যতা’ এবং ‘পোশাক’ দুটোই আলাদা দুটি বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের সভ্যতায় এই দুটো বিষয়ই যেন একই সূত্রে গাঁথা। আমাদের দেশে পোশাক ছাড়া সভ্যতাকে কোনোভাবেই কল্পনা করা যায় না। আর পোশাক নিয়েই কাজ করে চলেছে বাংলাদেশের তাঁতিরা। বাস্তবতা হলো অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত থাকার পরেও আমাদের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়েই দেশের বিভিন্ন জেলার তাঁতশিল্পের দক্ষ কারিগররা তাদের বংশ পরম্পরায় তাঁতের নানা ধরনের কাপড় তৈরি করে চলেছেন। স্যালুট, তাঁতশিল্পের এই শিল্পীদের।
তাঁত আমাদের কৃষ্টি, আমাদের ঐতিহ্য। আর নিজস্ব ঐতিহ্যের সাথে থাকাই আমাদের গর্বের বিষয়।
Writer
Zohir Ahmed Ridoy
DWMTEC - WPE
Executive Ambassador




0 মন্তব্যসমূহ