Latest Textile | Habibur Rahman
আজকের প্রস্তাবনা টা খুবই তিক্ত একটা বিষয়ে। আমরা যারা কর্মকর্তা ও কর্মচারী হিসেবে কাজ করছি, তাদের মাইন্ড সেট নিয়ে আমার দুই দশকের পর্যবেক্ষণ বলা যায়।
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই আমরা সবাই শুধু জানতে চেয়েছি এই অবস্থায় আমাদের কি কি করণীয়। আমাদের পোশাক শিল্পের যে ১০ লক্ষ কর্মকর্তা ও কর্মচারী হিসেবে যারা নিয়োজিত আছেন, তাদের মধ্যে আমরা যারা এসি অফিসে বসে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, তাদের নিয়ে প্রথমত কিছু তিক্ত সত্য কথা লিখবো, এর পরে তাদের করণীয় নিয়ে লিখবো ! কারণ আমি তো নিজেই ওই গোত্র অন্তর্ভুক্ত। তাই নিজের সমাজ টাকে নিয়ে কথা বলি।
▶️ প্রথমত নিজেকে প্রশ্ন করুন তো!
✔️আপনি কি কি করেছেন এতদিন?
✔️আপনার নিজের উন্নতির জন্য?
✔️কোম্পানীর জন্য?
✔️ইন্ডাস্ট্রির জন্য, দেশের জন্য?
জানি, সবার মনে মনে উত্তর হবে, আরে আমিই তো সব কাজ করি অফিসে!
এই সময়টাতে আপনার নিজস্বতা থেকে বের হয়ে নিজেকে সমালোচকের দৃষ্টিতে দেখুন দয়া করে।
আপনি যদি আত্মউপলব্ধি সম্পন্ন বিবেকবান হিসেবে নিজেকে প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করতে না পারেন তাহলে আমার এই লেখা আপনার জন্য না।
আমার সুযোগ হয়েছে বাংলাদেশের অনেকগুলো নামকরা ফ্যাক্টরিতে কিছু কিছু প্রজেক্টে পুরো ম্যানেজমেন্ট টিম এর সাথে কাজ করার। তাই কাছে থেকে দেখেছি, শিখেছি অনেক কিছু। একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা এই লেখা।আপনারা জেনে অবাক হবেন অন্তত একশত জন সফল পোশাক শিল্পোদ্যোক্তা তাদের অফিস টিম নিয়ে কোন মোটেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে পারেন নাই আমার কাছে। কিন্তু কি করবো হাবিব এর চেয়ে ভাল লোক যে আর পাচ্ছিনা, আপনার কাছে থাকলে আপনি দেন কয়েকটা সিভি , আমরা তো অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু অবস্থার উন্নতি হচ্ছেনা।
কয়েকজন এমডি সাহেব আলাদা ইনস্টিটিউট করার অর্থ পর্যন্ত প্রদান করার অফার দিয়েছিলেন। উনাদের কথা হল আমাদের মিডলেভেল ম্যানেজমেন্ট টিম আমরা তৈরী করতে ব্যার্থ হয়েছি। এই যে আমরা যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণী টা অফিসিয়াল কাজ করি তাদের কয়েকটা ক্যাটাগরি তে ভাগ করা যায়।
✔️১. স্মার্ট গোত্র : হাতে গোনা কয়েকজন বৈধ/অবৈধ ভাবে অনেক টাকা কামিয়েছেন, গাড়ি বাড়ি করেছেন, শুধুই সাময়িক ভাবে আর্থিক উন্নতি করেছেন একান্ত নিজের জন্য, আর পরিবার ও সন্তানকে খাইয়েছেন অবৈধ ইনকাম এর দামী দামী খাবার। পোশাক কিনেছেন থাইল্যান্ডে গিয়ে। সপরিবারে ইউরোপ ট্যুরে গিয়ে সেল্ফী তুলে ১০০০ লাইক পেয়েছেন !
আমাদের সবার চোখে এই গোত্র টি স্মার্ট গোত্র বলে পরিচিতি লাভ করে খুব তাড়াতাড়ি। নতুন কিছু শিখতে বললে উনাদের আতে ঘাঁ লাগে , তাহলে এতদিন কিভাবে এতবড় ইন্ডাস্ট্রি চালাচ্ছি আমরা, একটু বলবেন, বলে প্রশ্ন করে বসে। নতুন টুল, সল্যুশন শিক্ষার আগ্রহ, মানসিকতা বা সময় তাদের হাতে খুবই কম থাকে। এনাদের দামি পোশাক, দামী ঘড়ি, সুন্দর চুলের কাট , বাচন ভঙ্গিতে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির টান থাকবেই। ফেসবুকে ইনাদের অনুসারীর সংখ্যা ঈর্ষান্বিত ভাবে বেশি থাকবে, অনুসারীদের সকলেই তাদের মত সুখী জীবন যাপন করতে চায়। এদের চিহ্নিত করুন আর দূরে থাকুন। ইন্ডাস্ট্রি, স্বীয় প্রতিষ্ঠান আর দেশের সর্বনাশে এনারা দায়ী। তবে সুসংবাদ হল ম্যানেজমেন্ট কিন্তু এনাদের নজরদারিতে রাখেন, জানেন এবং সব বুঝেন। চাকুরী থেকে বিদায় করার ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট অবশ্যই দুষ্ট গরু আগে খুঁজবেন।
✔️২. অলস গোত্র : যারা অবৈধ ইনকাম করেন নি এবং করতে পারেননি তারা আলসেমি, সবকাজে সহজ পন্থা খোঁজ করা, কত তাড়াতাড়ি কোন মতে শেষ করতে পারবো আজকের এই দিনটা, সারা দিনে নতুন কোন কিছু না শিখা ইত্যাদিতে লিপ্ত ছিলেন।
এই গোত্র টার বেতনের টাকা ২৫ তারিখে শেষ হয়ে যায়, এঁরা মুদির দোকানে বাকি খেয়ে জীবন ধারণ করে থাকে। বউয়ের খোঁটা তাদের সহ্য হয়ে গিয়েছে। এই গোত্র টি বিপদ বা ঝামেলা দেখলেই নিজেকে গুটিয়ে নেয় অথবা কেটে পড়ে।
এই সমাজ টার আয় ও উন্নতি উভয়েই অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। সংখ্যায় এই গোত্র টাই প্রায় ৮০% । এই গোত্র টাই সবচেয়ে চাকুরীর রিস্কের ভিতর আছে এখন এবং ছাটাই করলে এদের মাঝ থেকে বাছাই শুরু হবে। এই শ্রেণীটা কিন্তু স্মার্ট গোত্রের চেয়ে বেশি ক্ষতি করছে ইন্ডাস্ট্রির ! সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপারটা হল, এনাদের প্রশ্ন করলে এনারা দুর্দান্ত ব্যস্ততার দোহাই দিতে পারে, সারাদিন কাজ করে শেষ করতে পারেনা , দুপুরে সময় মত খাবার খাওয়ার সময় ও পায়না, বাড়িতে ঠিক সময় মত কোনদিন যেতে পারেনা, শ্বশুর বাড়ির পক্ষের কোন দাওয়াতে অংশগ্রহন করতে পারেনা, মায়ের জন্য ঔষধ কিনতে সময় বের করতে পারেনা।
যেহেতু এত ব্যস্ত থাকে তাই তাদের কাজ ও গোছানো থাকে না , কাজের মাঝে প্রচুর ভুলভ্রান্তি পাওয়া যায়, তার কাজ সময়মত শেষ হয়না জন্য নিজের ডিপার্টমেন্ট সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট ও ভোগান্তির স্বীকার হয়। মোট কথা পরিকল্পনাহীন ভাবে যাচ্ছেতাই অবস্থায় সব কিছু এলোপাথাড়ি ভাবে করতে পারাটাই যেন তার দশ, পনের বছরের অভিজ্ঞতার ফলাফল।
নতুন কিছুই শিখতে সময় পায়না তাই বছর শেষে উন্নতি ও হয়না। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ঝক্ঝকে বাচ্চা ছেলেটা কেন তার চেয়ে বেশি বেতনে জয়েন করলো, এই নিয়ে তার আফ্সোসের সীমা থাকেনা। এই গোত্রে ছেলে মেয়ে উভয়েরই ফেসবুকে কোন জনপ্রিয়তা থাকেনা, কিন্তু তারা সারাক্ষন ফেসবুকে অন্যান্য দের সুখ দেখতে থাকেন। পোশাক, কসমেটিক্সে তাদের দৈন্যতা বড়োই পীড়াদায়ক। পড়েছেন নিশ্চয়ই ৫০% কর্মচারী চাটাই হওয়ার সম্ভাবনা দেখা গিয়েছে। আপনি ওই এক নম্বরে আছেন।
✔️৩. চাটুকার গোত্র : অতিমাত্রায় তেলবাজ , নিজে প্রচন্ড ফাঁকিবাজ , সারাদিন বসের গুনকীর্তন, নিজের পান্ডিত্য জাহির, এমনকি এরা বসের বাসার বাজার পর্যন্ত করে দিয়ে থাকে। এই গোত্র হল অকর্মণ্যের ঢেঁকী। আপনি আপনার আসে পাশে তাঁকান। অস্যংখ্য দেখতে পারবেন। আজকে যখন ৫০% মানুষ ব্যাড পড়ার ঘোষণা আসছে তখন কিন্তু এরা কোন এক ভাবে সুচতুর কিছু করে টিকেই যাবে , সমস্যা হবে আপনার আমার মত অবলা প্রজাতিটার।
✔️৪. দেশের গর্ব গোত্র : এর বাইরে আর একটা ধরণ আছে তাদের নিদৃষ্ট লক্ষ্য আছে, ভবিষ্যৎ কর্ম পন্থা মোটামুটি প্ল্যান করে চলে, তুলনামূলক ভাবে সৎ, প্রতিনিয়ত নিজের জন্য হলেও কিছু শিক্ষার চেষ্টা তাদের মাঝে থাকবেই। খেয়াল করে দেখবেন কোন কাজে না বলেন না।
এইখানে ছেলে হোক মেয়ে হোক সকলেই প্রচন্ড ছিমছাম, সামাজিক, বিনয়ী, পরিপাটি , ভুল মেনে নেয়ার মানসিকতা, দ্রুত মেনেনিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করা। পার্থক্য টা এখানেই, উনি নিজে শিখলে তার প্রভাব তার কাজের মাঝে পড়বেই, তার কাজে নতুন নতুন টুল এর ব্যবহার দেখা যাবে, তার কাজে ইফিসিয়েন্সি লক্ষণীয় হয়ে উঠবে, এবং অবশেষে প্রতিষ্ঠানটা উপকার পাওয়া শুরু করবে। প্রতিষ্ঠান উপকৃত হলে ইন্ডাস্ট্রি তার ফল পাবে, ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে।
আপনারা সকলেই আপনাদের মাঝে ঐ উজ্জ্বল মুখ গুলো চিনেন। আপনাদের ছেড়ে তারা এক সময় বড় জায়গায়, ভালো জায়গায়, সম্মানিত ভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে। আমাদের দেশেই অনেক বড় ব্র্যান্ডে , বিদেশী প্রতিষ্ঠানে, দেশীয় বড় কোম্পানী তে এই সকল উজ্জ্বল মুখ গুলোর নাম আপনাদের জানা।
তাই আজকে ৫০% কর্মচারী ছাটাইয়ের ঘোষণা আপনাকে আমাকে শংকিত করে তোলাটাই স্বাভাবিক, কারণ আমরা মানব সম্পদে নিজেদের পরিণত করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা এখন কোম্পানীর লায়াবিলিটি।
আমি কর্মচারী হিসেবে কোম্পানির পরিপূর্ন দোষ দিতে পারছিনা। আমরা নিজেরাই এই অবস্থার জন্য দায়ী।
দেশের রপ্তানী আপনার আমার জন্য অন্তত ২০% ব্যহত হয়েছে। আসুন এই মহামারী থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন ভাবে নিজেকে গড়ি, ইন্ডাস্ট্রিটা কে নিয়ে নতুন ভাবে পরিকল্পনা করি।
প্রয়োজনে যোগাযোগ করবেন আশা করছি। ধন্যবাদ।
Writer:
Habibur Rahman
Smart Factory 4.0 Consultant for Textile Apparel Industries;
County Head, Quantity Improvement Solutions;
Founder, Jobs For U.
LinkedIn Profile
x





0 মন্তব্যসমূহ