
২০ লক্ষাধিক পোশাক শ্রমিকদের ঈদ বেতন-বোনাস ছাড়া?
Latest Textile | নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এবার ২৯ রোজা হলে আর মাত্র বাকি আছে তিন দিন। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশের প্রায় ২০ লক্ষাধিক পোশাক শ্রমিক আসন্ন এ ঈদে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরবেন। এসব পোশাক শ্রমিক যেসব কারখানায় কর্মরত আছেন, তাতে এখন পর্যন্ত এপ্রিল মাসের বেতনই দেয়নি; ঈদ বোনাস তো অমাবস্যার চাঁদ। এই শ্রমিকদেরও পরিবার আছে, তাদের মুখে হাসি ফুটানো তো দূরে থাক, খাবারও হয়তো তুলে দিতে পারবে না অনেকে!
হিসাব বলছে, পোশাক খাতে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক প্রায় ৪২ লাখ। শিল্প পুলিশের তথ্য মতে, গত সোমবার পর্যন্ত সারাদেশের ৭ হাজার ৬০২টি পোশাক কারখানার মধ্যে এপ্রিলের বেতন পরিশোধ করেছে ৩ হাজার ১৭৫টি, যা অর্ধেকেরও কম। বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে রপ্তানি প্রক্রিয়া অঞ্চলের (বেপজা) ভেতরে অবস্থিত কারখানা। আর পিছিয়ে আছে বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানা। সূত্র: আমাদের সময়।
প্রতিদিন শ্রমিকদের আন্দোলন করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলেও তারা পেটের দায়ে পথ ছাড়তে পারছেন না। বেতন-বোনাসের দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভারের ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি পোশাকের কারখানা অধ্যুষিত এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ হচ্ছে।
জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, সরকার "৫০% বোনাস" ঈদের আগে দেওয়ার কথা বললেও অনেক কারখানা তা মানছে না। মাঝারি আকারের ও সাব-কন্ট্রাকে কাজ করা বেশিরভাগ কারখানা সরকারি শ্রমিকদের জানিয়ে দিয়েছে, তারা বোনাস দিতে পারবে না। বোনাস না দেওয়ায় মিরপুরে কারখানা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ১ হাজার ৮৮২টি কারখানার মধ্যে বেতন পরিশোধ হয়েছে ৯৯১টি কারখানা। বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। মোট ১ হাজার ১০১টির মধ্যে বেতন হয়েছে ৩৮৮টিতে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্যভুক্ত ৩৮৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেতন হয়েছে ১৯৮টিতে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (বেপজা) ভেতরে অবস্থিত বেশিরভাগ কারখানা বেতন পরিশোধ করেনি। অন্যান্য ৩৮৬৬টির মধ্যে ২ হাজার ৫৭২টি কারখানা বেতন দেয়নি।
যদিও শিল্প পুলিশের তথ্য সঠিক নয় দাবি করে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, সোমবার পর্যন্ত সদস্যভুক্ত এক হাজার ৫০৯টি কারখানায় এপ্রিলের বেতন দেওয়া হয়েছে। আর ৩৩টি কারখানা বোনাস দিয়েছে। বিজিএমইএর সব কারখানা ঈদের আগে বেতন-বোনাস পরিশোধ করবে বলে জানান তিনি।
বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এপ্রিলের বেতন সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী হবে। এখানে মালিকদের কিছুই করার নেই। নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতনের সব কাগজপত্র ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন ব্যাংক টাকা শ্রমিকদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে পাঠাবে। এতে ব্যাংক ব্যর্থ হলে দায়দায়িত্ব মালিকরা নিতে পারবেন না। কারণ আমরা আগেই বলেছি, এ সিস্টেম বেতন দিতে গেলে জটিলতা দেখা দেবে। তিনি আরও বলেন, অনেক কারখানার আবেদন ব্যাংকগুলো প্রসেসই করেনি। সে ক্ষেত্রে ওইসব কারখানার বেতন দিতে ব্যর্থ হবে। এর দায় মালিকদের দেওয়া যাবে না। শিল্প এলাকায় শুক্র ও শনিবার ব্যাংক খোলা রাখার দাবি জানান তিনি।
জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কেএম আলী আজম বলেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সব সময় শ্রমিকের অধিকার আদায় কাজ করে। বেতন-বোনাসের বিষয়ে মালিকদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে কয়েকদফা বৈঠক করেছে। বৈঠক থেকে একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা মালিক ও শ্রমিকপক্ষ উভয় মেনে নিয়েছে। ঈদের আগেই সব শ্রমিককে এপ্রিল মাসের বেতন বকেয়া পাওনা পরিশোধ করার কথা। পাশাপাশি ঈদের আগে বোনাস পরিশোধ করার কথা রয়েছে। এর পরও শ্রমিকদের রাস্তা অবরোধ করা, ভাঙচুর করা অপ্রত্যাশিত।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত কারখানাগুলো পরিদর্শন করা হয়। কোথাও কোনো অসঙ্গতি পেলে সে অনুযায়ী রিপোর্ট করা হয়। মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও বিধান রয়েছে।
আমরা শিল্পকারখানা মালিকদের বারবার অনুরোধ করছি, যাতে তারা শ্রমিকদের পাওনা দিয়ে দেন।
যদিও বোনাস কখন, কীভাবে দেওয়া হবে তার কিছুই জানে না শ্রমিক নেতারা। বোনাসের অর্থ মোবাইলে পাঠানো হবে, নাকি নগদ দেওয়া হবে সে বিষয়ে পুরোপুরি অন্ধকারে আছেন তারা। এদিকে বোনাসের দাবিতে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে কারখানা ভাঙচুর চালায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, মালিক-শ্রমিক ভুল বোঝাবুঝির কারণে এখন শ্রমিকরা রাস্তায়। শ্রমিকদের ভালোভাবে ডেকে বুঝিয়ে কথা বললে হয়তো তারা রাস্তায় নামত না। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে শ্রমিকরাও অবহিত। কিন্তু তাদের ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, যেসব কারখানা বেতন-বোনাস দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে তারাও এখন এদিক-সেদিক করছে।
তিনি বলেন, বিজিএমইএ-বিকেএমইএ সদস্য ছাড়াও অনেক সাব-কন্ট্রাক্ট কাজ করা কারখানার শ্রমিকরাও এখন রাস্তায় নেমেছে। এসব কারখানার মালিকরা সরকারের দেওয়া পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা পাবে না। এসব মালিকরাও এখন হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলেন, বোনাস তো দূরের কথা। যে ধীরগতিতে এপ্রিলের বেতন দেওয়া হচ্ছে, তাতে ঈদের দিনও সব কারখানার শ্রমিকরা বেতন পাবে না কিনা সন্দেহ আছে। মালিকপক্ষের গাফিলতির কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অবস্থা ভয়ঙ্কর জায়গায় চলে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা তহবিল ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেটি শ্রমিকদের পকেট পর্যন্ত যাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতে যতটা উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল, তা করা হয়নি। ফলে মালিকরা স্বেচ্ছাচারীর ভূমিকায় অবর্তীন হয়েছেন।
তিনি বলেন, শ্রমিকরা তাদের পাওনা আদায়ের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারছেন না। ফলে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।




0 মন্তব্যসমূহ