সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরী, গল্পের চারিত্রিক নামগুলো কাল্পনিক
বাড়তি বয়সের গ্রামীন কিশোরী সেলিনা ছিলো অন্যদের তুলনায় বেশ মেধাবী ছাত্রী। ইস্কুলে তার বেশ নাম ডাক ছিল, ক্লাসে ১ম হওয়া সত্ত্বে মাস্টার মশাইদেরও প্রিয় ছিল সেলিনা। এছাড়াও সে খেলাধুলা সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। রুপ ও গুনে ছিল অনন্যা। সেলিনার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একজন ডাক্তার হবে। কারণ, ছোট্ট কিশোরীর মনে তখন থেকেই ছিল গ্রামের মানুষের দুর্দশার অবস্থা ও মানুষের জন্য নিদারুণ প্রেম ভালবাসা। সে ছিল সর্বদা পরোপকারী মনোভাবাপন্ন এক মহামানবীর আত্মা। আজ সে বড় হয়েছে বটে কিন্তু ডাক্তার হতে পারেনি বরং হয়ে গেছে ব্যস্ত শহরের এক গার্মেন্টস কর্মী।
১লা জানুয়ারি, ২০০৭
সেলিনা চতুর্থ শ্রেণি হতে ১ম স্থান অর্জনের মাধ্যমে ৫ম শ্রেনিতে উত্তীর্ণ হলো। বাবা-মা, ও স্কুলের মাস্টার মশাইগন সেলিনার কৃতিত্বে সন্তুষ্ট ছিলেন। স্যারদের বিশ্বাস ছিল সে ৫ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাবে। কারণ, তৎকালীন ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় তার মেধা ও তীক্ষতা ছিল বেশ প্রখর। সে নিজের ক্লাসের পাশাপাশি উপরের ক্লাসের ছাত্রীদের প্রিয় পাত্রী ছিল এতে করে লেখাপড়া সহ অন্যান্য বিষয়ে এগিয়ে থাকতো সে। এজন্যই শিক্ষক শিক্ষিকাগন তার প্রতি ছিল বেশ সদয় ও সন্তান সুলভ। ৫ম শ্রেনীর বার্ষিক পরীক্ষায় সে জেলা পর্যায়ে স্ট্যান্ড করল। পুরো স্কুল ও সবাই বেশ আনন্দিত ছিল তার কৃতিত্বে।
এবার হাইস্কুলে যাবে সেলিনা। নতুন স্কুল, নতুন নতুন মানুষ, সবকিছুই অন্যরকম। কিন্তু তার গ্রামে কোনো হাইস্কুল না থাকায় পাশের গ্রামে সুধীরপুরে ভর্তি হয় সেলিনা। বাবা কৃষক সংসারের হাল টানতেই হিমশিম খেতে হয় তাকে। তবে, মাস শেষে মোটামুটি ভালো ভাবেই কেটে যায় সংসার।
মজিদ কে প্রাইমারী ইস্কুলে ভর্তি করা হলো। সে ও তার বোন সেলিনা ইস্কুলে যাওয়ার সময় একই সঙ্গে রওনা দেয় প্রতিদিন। মজিদের স্কুল কাছেই তাই বাকীটা পথ একাই যেতে হয় সেলিনাকে।
মাস দুয়েক এভাবেই চলতে লাগল। কিন্তু, তার এই সুখ যেন দীর্ঘ স্থায়ী হলোনা। তখন বাজে বিকেল ৪ টা ১৯ মিনিট। স্কুল থেকে ফেরার পথে একটা সময় রাস্তার বখাটে ছেলেদের পাল্লায় পড়ে সে। তাদের মধ্যে একজন নাম এখলাস উদ্দীন মোল্লা, বয়স ২৩ বছর। তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয় কিন্তু সেলিনার কাছে ব্যাপারটি বোধগম্য হয়নি। কারণ, ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া ছাত্রী এসব না বোঝায় ও তাকে ভালো না মনে হওয়ায় তাকে তার পথ থেকে সরে যেতে বলে।অতঃপর এখলাস সরে গেল কিন্তু তার পাগলামি রয়েই গেল।
এখলাস প্রতিদিনই তার আসা যাওয়ার পথে দাড়িয়ে থাকতো আর প্রতিদিনের মতোই প্রপোজাল দিত।আর, সেলিনারও উত্তর একই থাকতো, "না!"
এভাবে, ৪ মাস কেটে গেল। এখলাস গ্রামের রউফ চেয়ারম্যানের ভাস্তে হওয়ার দরুণ সে প্রতিনিয়তই মেয়েদের সাথে অশ্লীলতা করেও পার পেয়ে যেত। সেলিনার মধ্যে ইদানীং ভয় কাজ করে। বাড়িতে কয়েকবার বলেছে সে। কিন্তু কৃষক বাবা তার কথায় তেমন পাত্তা দেইনি। মা সাজেদা খাতুনও তাকে বলেছে, "বড় ভাইয়েরা মজা করেই এসব বলে তার তুই তো অনেক ছোট, তা-ই এমন করে।"
সেলিনা যেন একাকিত্বে পড়ে গেল। তার কোন কথাতেই কোন কাজ হলোনা।
১২ই জুন, ২০০৮ দিনটি ছিল সেলিনার জীবনের ভয়াবহ আতঙ্কের একটি দিন। সাড়ে ৪ টায় এখলাসের উত্তর দেওয়ার শেষ দিন ছিল। কিন্তু, সেলিনা ও মনে করেছিল সে হয়তো মজাই করছে! কিন্তু তা নয়! আজ সে এখলাসের সাথে আরও তিন জন ছেলে দেখতে পেলো। তারা দূরে দাড়িয়ে আছে আর এখলাস সেলিনার সামনাসামনি। সেলিনার উত্তর না হওয়ায় এখলাস জোরাজোরি করতে লাগলো, সেলিনাকে স্পর্শ করে কথা বলতেছিল। তার আপত্তিকর আচারণ করায় সেলিনা বখাটে এখলাস কে থাপ্পড় মারল, এতে এখলাস খিপ্র হয়ে সেলিনাকে আঘাত করল এবং সেলিনা জ্ঞান হারাল। সেই সুযোগে এখলাস তার বখাটে বন্ধুদের সহায়তায় সেলিনাকে রাস্তার পাশের আখ ক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করল। জ্ঞান ফেরার পর সেলিনার শরীরে রক্ত দেখে চিৎকার দিয়ে উঠল কিন্তু জনশুন্য পথে কে শুনে কার কথা। সে প্রচুর কান্না করে, তার শরীরে অন্যরকম এক ব্যাথা।
অতঃপর সে বাড়িদিকে রওনা হলো তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে চারিদিকে অন্ধকার। বাড়ি ফিরতে দেরি হলো। ওইদিন হাট থাকায় রহিম মিয়া বাড়ি ছিলনা। সেলিনা বাসায় এসে তার মাকে সব খুলে বললে তার মা কান্নায় ভেঙে পড়ে ও সেলিনার মাথায় হাত বুলাতে থাকে আর বলতে থাকে একি হলো তোর! মা আমার!
রাতে সেলিনার ১০২° জ্বর। রাতভর মা সাজেদা খাতুন সেলিনার সেবা যত্নে বিভর থাকে। রাতে সেলিনার জ্বর যেন কমছেই না। মা সেলিনার চিন্তায় ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিল। রাতে তার চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেল। রাত ৩ টার দিকে সেলিনার জ্বর কমলে সাজেদা কিছুটা স্বস্তি পেলেও যে ক্ষতি তাদের হয়েছে তার দাগ যেন হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছে। মুখে তার ছাপ প্রতিফলিত হচ্ছে।
পরদিন রহিম মিয়া বাসায় আসলে সাজেদা তাকে সবকিছু খুলে বলে। রহিম মিয়া গরীব কৃষক হওয়ায় ভয়ে ভীত হয়। এবং সে তার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। লোকে জানলে তার মান সন্মান ধুলিষ্যাৎ হয়ে যাবে। গরীব কৃষক মজিদের কাছে সব হারিয়েও সে তার সামাজিক সন্মান নষ্ট হওয়ার ভয়ে পড়ে যায়। এবং, বিষয়টি যেন কেউ জানতে না পারে বাড়ির সবাইকে হুশিয়ার করে দেয়।
সেলিনার স্কুলে যাওয়া প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে বলা চলে। এক মাস সে স্কুলে যায়না, আগের থেকেও রোগা হয়ে গেছে। বাবা মজিদ তাকে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। মজিদ গরীব হলেও সেলিনা ছিল তার একমাত্র কলিজার টুকরা। সে এবার চিন্তা করল এভাবে চলতে থাকলে সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে তাই অন্য এক বন্ধুর সাথে পরামর্শ করে সেলিনাকে এবার মাদরাসায় ভর্তি করা হলো। মাদরাসা আরো দুরে হওয়ায় তার থাকার ব্যাবস্থা বন্ধুর বাড়িতে করা হলো। বেশ কিছুদিন কেটে গেল বিষয়টা শান্ত হয়ে গেল। কিন্তু, সেলিনার মুখের হাসি ও তারুণ্যের ছোঁয়া যেন বিলুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে।সেলিনা এখন মাদরাসায় যায়। কিন্তু, এখানেও তার শান্তি নেই। আবার ঘটল ঘটে যাওয়া অন্ধকারের গল্প। কিন্তু, হ্যা এবার কোনো বখাটে নয় এবার এই ঘৃণ্যকাজে জড়িয়ে পড়ল এক মাদরাসা শিক্ষক।
কিশোরী সেলিনার আর্তনাদ চার দেওয়ালের মধ্যেই চাপা পড়ল। মাদরাসা শিক্ষকের নাম বলতে কঠোর হুশিয়ারি করে দেয় হুজুর এবং বিষয়টি যেন কেউ না জানতে পারে তার জন্য ও সেলিনাকে নানান ভয় ভীতির মাধ্যমে শায়েস্তা করা হলো। এভাবে, ৬ মাস সেলিনাকে ভোগ করলেন সেই শিক্ষক নামের হিংস্র নরপশু। অনেক সাহসের পরও বিষয়টি কাউকে জানাতে পারেনি সেলিনা।
কিন্তু, এই একই সময়ে কিছু মাদরাসার ছাত্ররা মাসয়ালা হুজুরের সাথে সেলিনার গোপন দৃশ্য দেখে ফেলে। অতঃপর, তারা সেলিনাকে ব্লাকমেইল করে একাধিকবার ধর্ষণ করতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যায় মাদরাসা প্রধান শিক্ষক অর্থাৎ বড় হুজুরের নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে তিনি ওই মাসয়ালা হুজুরকে বরখাস্ত করেন এবং মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের কঠোর শাস্তি দেন। এবং সেলিনার বাবা কে মাদ্রাসায় আসার জন্য খবর দেয়া হলো।
মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক অর্থাৎ বড় হুজুর মাওলানা মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী ছিলেন বেশ উদার মনের মানুষ। তিনি একাধারে ছিলেন একজন ইসলামিক আলেম, ইমাম, ন্যায় পরায়ণ, সুচিন্তক ও সমাজের একজন সন্মানিত ব্যাক্তি। দরিদ্র কৃষক আবদুল মাজেদ মিয়া দুইদিন পর মাদ্রাসায় আসলেন তখন মাদ্রাসার নাম ও মেয়ের ক্ষতির কথা স্পষ্টভাষী ভাবে বললেন বড় হুজুর ইদ্রিস আলী। মাজেদ মিয়া প্রচুর কাঁদলেন... কিন্তু, যা হওয়ার তা তো হয়েছে এখন আর কেদে কি লাভ? বললেন বড় হুজুর।
ইদ্রিস আলী (বড় হুজুর) তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন এবং ইসলামের ছায়াতলে এসব কুলাঙারদের কথা বললেন। কিন্তু, মাদ্রাসার নাম, সন্মান ও ইসলামের কথা চিন্তা করে থানা পুলিশ করতে মানা করলেন মাজেদ মিয়াকে। মাজেদ মিয়া নামাজ ঠিক মত না পড়লেও সে ছিল অতি ধর্মভীরু একজন মানুষ। সে বড় হুজুরের কথা মেনে নিলো। এবং ইদ্রিস আলী সাহেব তাকে পরামর্শ দিল সেলিনাকে যে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দেয়। তখন,অসহায় মাজেদের আর কিছুই করার ছিলোনা সুতরাং সে হুজুরের কথা মেনে মেয়েকে নিয়ে বাড়ী চলে আসলো।
২রা জানুয়ারী, ২০০৯ সাল
মজিদ মিয়ার আর্থিক অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে থাকল। আর, মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা যেন মাথা থেকে নামছেই না। অতঃপর করিমগঞ্জ হতে মজিদের এক বন্ধু বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলে মজিদ রাজি হয়ে যায় ও সেলিনার বিয়ে দিয়ে দেয়।
সেলিনার স্বামী রিয়াজ উদ্দিন, বয়স ৩২। আগে দুই বউ মারা গেছে। প্রথম কিছু দিন কাটার পর রিয়াজের আসল স্বরুপ সেলিনার সামনে প্রকাশিত হতে থাকে। তার গঞ্জিকা সেবন, মদ্যপান, জুয়া ও নারী লোভী বিষয়গুলো প্রকাশ হতে থাকে।
এতোদিনে এক সন্তানের মা হয়ে যায় সেলিনা।
অসহায় সেলিনা আজ ভাগ্যের পরিহাসে নিরুপায়।
সেলিনার সন্তানের নাম মোহাম্মদ হাবিল উদ্দীন। হাবিল মায়ের কোলে বেড়ে উঠতে লাগলো। কিন্তু, ইদানীং স্বামী রিয়াজ দিনদিন নির্দয় পাষাণ হয়ে পুরনো নারীনির্যাতন শুরু করে সেলিনার সাথে।অত্যাচারের মাত্রা দিনদিন বেড়েই চলল। একদিন মাতাল অবস্থায় সেলিনা প্রচুর মারধোর করে। হঠাৎ হাত ফসকে গিয়ে একটি আঘাত শিশু হাবিলে গায়ে লাগে। প্রচুর রক্তক্ষরনের মাধ্যমে মৃত্যু হয় হাবিলের...
বাকি অংশ প্রকাশিত হয়েছে Latest Textile ম্যাগাজিন (পৌষ ১৪২৭)-এ





0 মন্তব্যসমূহ